
কুমিল্লা প্রতিনিধি।।
যে উঠানে কিছুক্ষণ পর স্বামীর জানাজা হওয়ার কথা, সেই উঠানেই হঠাৎ স্ত্রীর কান্না থেমে গেল চিরতরে। জানাজার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে স্বামীর শোকে কাঁদতে কাঁদতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন সালেহা বেগম (৫৬)। মুহূর্তেই স্বামীর লাশের পাশে রাখা হলো স্ত্রীর লাশও। শেষ পর্যন্ত একই জানাজায় বিদায়, পাশাপাশি কবরে চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন স্বামী-স্ত্রী।
হৃদয়বিদারক এ ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার মাইজখার ইউনিয়নের রাণীচড়া গ্রামে। মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) দুপুরের এ ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।
মৃত দম্পতি হলেন রাণীচড়া গ্রামের আব্দুস সাত্তার (৬১) ও তার স্ত্রী সালেহা বেগম (৫৬)। দীর্ঘ সংসারজীবনে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জনক-জননী ছিলেন তারা। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে নয়, মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সন্তানদের মাথার ওপর থেকে সরে গেল বাবা-মায়ের ছায়া।
স্থানীয়রা জানান, সোমবার (১০ আগস্ট) বিকেলে হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন আব্দুস সাত্তার। দ্রুত তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। চিকিৎসাধীন অবস্থায় সেখানেই মৃত্যু হয় তার। মঙ্গলবার সকালে স্বজনরা মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসেন। বাদ জোহর জানাজার সময় নির্ধারণ করে শুরু হয় দাফনের প্রস্তুতি। বাড়ির পাশে খোঁড়া হয় কবর। স্বজন, প্রতিবেশী ও এলাকাবাসী অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায় জানানোর জন্য।
কিন্তু কে জানত, সেই বিদায়ের আগেই অপেক্ষা করছে আরও এক নির্মম সংবাদ!
জোহরের নামাজ শেষ হয়েছে। জানাজার আর মাত্র পাঁচ মিনিট বাকি। স্বামীর নিথর দেহের দিকে তাকিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন সালেহা বেগম। পরিবারের সদস্যদের সামনে অঝোরে কাঁদছিলেন তিনি। একপর্যায়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্বজনরা দ্রুত তাকে সামলানোর চেষ্টা করলেও মুহূর্তের মধ্যেই নিথর হয়ে যান তিনি।
স্বামীর জানাজার জন্য যে বাড়িতে কান্নার রোল উঠেছিল, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই কান্না পরিণত হয় আরও তীব্র আহাজারিতে। স্বজনদের চোখের সামনে যেন একসঙ্গে নিভে গেল একটি পরিবারের দুই প্রাণের আলো।
একদিকে বাবার মরদেহ, অন্যদিকে মায়ের নিথর দেহ—এমন দৃশ্য দেখে সন্তানদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে রাণীচড়া গ্রামের বাতাস। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে বাবা-মাকে হারিয়ে সন্তানরা যেন বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না ঘটে যাওয়া নির্মম বাস্তবতা।
পরে দুপুর আড়াইটার দিকে স্থানীয় মাঠে একইসঙ্গে আব্দুস সাত্তার ও সালেহা বেগমের জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে পাশাপাশি দুটি কবরে দাফন করা হয় তাদের।
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছিলেন পাশাপাশি। শেষ বিদায়ের পথটিও যেন আলাদা হলো না তাদের। স্বামীকে হারানোর শোক সহ্য করতে না পেরে স্ত্রীও চলে গেলেন তারই কিছুক্ষণ পর। শেষ পর্যন্ত পাশাপাশি কবরে শুয়ে রইলেন দু’জন—জীবনের মতো মৃত্যুতেও একসঙ্গে।
এই হৃদয়বিদারক ঘটনায় শোকস্তব্ধ পুরো রাণীচড়া গ্রাম। স্বজনদের চোখের পানি আর সন্তানদের বুকফাটা আহাজারিতে ভারী হয়ে আছে আব্দুস সাত্তার ও সালেহা বেগমের বাড়ির পরিবেশ।
নিউজডেস্ক,কুমিল্লা….!









