১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

Contribute News কনভার্টার

১১ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
HomeFirst leadঅলিগলি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ—কুমিল্লায় প্রকাশ্যে মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ

অলিগলি থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ—কুমিল্লায় প্রকাশ্যে মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ

madker

কুমিল্লা নগরীজুড়ে ভয়াবহভাবে বিস্তার লাভ করেছে মাদক ব্যবসা। অলিগলি থেকে শুরু করে ব্যস্ত সড়ক, আবাসিক এলাকা থেকে বাজার—প্রকাশ্যেই চলছে ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন, আইসসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের কেনাবেচার অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রশাসনের নাকের ডগায় দিনের পর দিন এই ব্যবসা চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। বরং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের ছত্রচ্ছায়ায় মাদক কারবার আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

নগরীর প্রতিটি অলিগলি, আবাসিক এলাকা, বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ থেকে শুরু করে ব্যস্ত সড়ক—বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি ও সেবনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। স্থানীয়দের ভাষ্য, ইয়াবা, গাঁজা, হেরোইন ও আইস এখন সহজলভ্য হয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর। দিন দিন বাড়ছে খুন, ছিনতাই, চুরি, কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য, চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র সংঘর্ষ। সমাজে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

নগরবাসীর অভিযোগ, মাঝেমধ্যে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হলেও আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। অভিযানে লোক দেখানো কিছু খুচরা বিক্রেতা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে কয়েকদিনের মধ্যেই আবার আগের মতো সক্রিয় হয়ে ওঠে মাদক কারবার।

সম্প্রতি কাটাবিল এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে কথিত মাদক কারবারিদের দুই পক্ষের সংঘর্ষে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী ইথান আহমেদ গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা পুরো কুমিল্লাকে নাড়িয়ে দিয়েছে। একটি নিরীহ পথচারী শিশুর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা থাকলে এমন ঘটনা কি ঘটত?

ঘটনার পর কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “স্কুলছাত্র গুলি খাবে, তারপরও আপনি ওসি থাকবেন—এটা ঠিক না।” একই সঙ্গে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, “মাদক নিয়ে কোনো আপস নয়। প্রয়োজন হলে লংমার্চ করবো।”

নগরীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা, ব্যবসায়ী, জনপ্রতিনিধি ও সচেতন নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গোলাবাড়ি, কাটাবিল, ধনপুর, চম্পকনগর, কুচাইতলী, হাউজিং এস্টেট, কাপ্তান বাজার, ভাটপাড়া, চান্দপুর, ছোটরা, মোগলটুলী, বৌবাজার, মাঝিগাছা, ছত্তরখীল, কালিয়াজুড়ি, বদরপুর, আড়াইওড়া, বিষ্ণপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রতিটি এলাকায় একাধিক গ্রুপ ভাগ হয়ে মাদক সংগ্রহ, পরিবহন, সংরক্ষণ ও খুচরা বিক্রির দায়িত্ব পালন করে। একজন গ্রেপ্তার হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই আরেকজন তার জায়গা নিয়ে নেয়।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নগরীর হাড্ডিখোলা সুইপার কলোনির বিপরীত পাশের একটি তিনতলা বাসার বাসিন্দা রত্না (৩৮), ধনপুর-চম্পকনগর সাতড়া এলাকার সাথী (৩৫), কাটাবিল এলাকার আবুল (৫৫), একই এলাকার ভুট্টু, হাউজিং এস্টেট গোলমার্কেট এলাকার অপু, কুচাইতলী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এলাকার সুমন (৪২), নগরীর ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাইফুল বিন জলিলসহ তার দল, কাটাবিলের অপু, আশিক ও শরিফের নাম স্থানীয়দের অভিযোগে উঠে এসেছে।

এ ছাড়া স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির একাধিক নেতাকর্মী, ১৪ নম্বর ওয়ার্ড, কাপ্তান বাজার, ঠাকুরপাড়া, ধর্মসাগরের পাড়, পাথুরিয়াপাড়া, বাড়পাড়া, ইপিজেড রোড, বালুতুবা, বিবিরবাজার সড়ক, পাক্কারমাথা ও গোমতী ব্রিজসংলগ্ন এলাকাসহ প্রায় প্রতিটি ওয়ার্ডের অলিগলিতে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হয়। আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক মাদকসেবনকারী দাবি করেন, নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে কিছু অসাধু পুলিশ সদস্য মাদক ব্যবসায়ীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন।

একইভাবে, পূর্বে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন কিন্তু বর্তমানে জড়িত নন—এমন একজন ব্যক্তি অভিযোগ করেন, মাসিক টাকা না দিলে গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়, আর নিয়মিত অর্থ দিলে নির্বিঘ্নে ব্যবসা চালানোর সুযোগ মেলে।

কাপ্তানবাজারে ধ্বংসকেন্দ্র ঘিরেও অভিযোগ

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, কাপ্তানবাজারের গোমতী নদীর পাড়ে অবস্থিত মাদক ও অবৈধ পণ্য ধ্বংসকেন্দ্রকে ঘিরেও দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, মাদক ধ্বংসের সময় প্রশাসনের উপস্থিতিতেই কিছু মাদকসেবী ও ব্যবসায়ী ধ্বংসের জন্য আনা মাদক ও অন্যান্য অবৈধ পণ্য সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু ব্যক্তি ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের যোগসাজশের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ কারণেই কেন্দ্রটির আশপাশে মাদক কার্যক্রমের বিস্তার উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, প্রতিটি এলাকায় কয়েক ডজন সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠা সংঘবদ্ধ চক্র নিয়মিতভাবে মাদক ব্যবসা পরিচালনা করছে। তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সাংগঠনিক শক্তি এতটাই বেশি যে সাধারণ মানুষ ভয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করার সাহস পান না।

একজন ব্যবসায়ী বলেন, “দিনের আলোতেই মাদক বিক্রি হচ্ছে—এমন অভিযোগ বহুদিনের। মাঝে মাঝে অভিযান হয়, কিন্তু কয়েকদিন পর সব আগের মতো হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।”

একজন অভিভাবক বলেন, “এখন সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েও নিশ্চিন্ত থাকা যায় না। ইথানের মতো ঘটনা আমাদের আতঙ্কিত করেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ না হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে পড়বে।”

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, স্থানীয়দের একটি অংশের অভিযোগ অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, এসব অভিযোগের কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।

একইভাবে স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের কিছু ব্যক্তির নীরব সমর্থন বা প্রভাবের কারণেও অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।

সমাজের নেটিজন ও বিশ্লেষকদের মতে, মাদক শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। মাদকাসক্তি থেকে জন্ম নিচ্ছে কিশোর অপরাধ, পারিবারিক সহিংসতা, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, অস্ত্রের ব্যবহার এবং হত্যাকাণ্ড। তাদের মতে, মাদকের অর্থনীতিকে ভেঙে না দিলে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করাও কঠিন হবে।

একজন সমাজ বিশ্লেষক বলেন, “মাদক শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। মাদকের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে না দিলে কিশোর অপরাধ, ছিনতাই ও সহিংসতা কমানো কঠিন হবে।”

সচেতন নাগরিকদের দাবি, ব্যক্তি, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা প্রভাবশালী অবস্থান বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসার অর্থের উৎস, পৃষ্ঠপোষকতা ও নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সচেতন নাগরিক বলেন, “মাদকবিরোধী অভিযান যেন শুধু খুচরা বিক্রেতাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। কারা এই ব্যবসার অর্থ জোগাচ্ছে, কারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে—সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। তাহলেই স্থায়ী সমাধান সম্ভব হবে।”

স্থানীয়দের একটাই দাবি—মাসোহারা বন্ধ হলে মাদক ব্যবসাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তাদের মতে, মাদক ব্যবসায়ীদের রোধ করতে না পারলে সমাজকে নিরাপদ করা কখনোই সম্ভব হবে না।

কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, “একজন স্কুলছাত্র গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। মাদকের বিরুদ্ধে কোনো আপস করা হবে না। যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, তাদের আইনের আওতায় আনতেই হবে। প্রয়োজন হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।”

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, “মাদক উদ্ধার শুধু পুলিশের একার কাজ নয়। কুমিল্লা সীমান্তবর্তী হওয়ায় মাদকের আগ্রাসন বেশি। মাদকের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। এ কারণে মাদক উদ্ধার ও আসামি গ্রেপ্তারে সারাদেশে কুমিল্লা জেলা পুলিশ দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে। আমাদের লক্ষ্য মূল ডিলারদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া। কুমিল্লা থেকে মাদক মূলোৎপাটন করতে চাই। বাহিনীর কেউ জড়িত থাকলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কুমিল্লাবাসীর প্রত্যাশা, একটি নিরীহ স্কুলছাত্রের রক্ত যেন আর কোনো পরিসংখ্যান হয়ে না যায়। মাদকের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক, নিরপেক্ষ ও কার্যকর অভিযান, প্রশাসনের জবাবদিহি এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনের সমান প্রয়োগই পারে নগরবাসীর নিরাপত্তা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে।